৬২ বাংলাদেশির বিনিয়োগ ৫০৮ কোটি

0
55

আমেরিকার কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিনকার্ড ক্যাটাগরি ইবি-৫-এ আবেদন করে গত তিন বছরে সফল হয়েছেন বিভিন্ন দেশের ১ লাখ ৯০ জন। এর মধ্যে ৬২ জন বাংলাদেশি। এ জন্য তাঁরা আমেরিকায় বিনিয়োগ করেছেন ৬২ মিলিয়ন ডলার বা ৫০৮ কোটি টাকা। আমেরিকার ভ্রমণ ও নন-ইমিগ্রান্ট ভিসা দপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইবি-৫ ক্যাটাগরির ভিসাটি ১৯৯০ সালে প্রণয়ন করা হয়। কর্মসংস্থানভিত্তিক এই ভিসার নিয়ম হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ধনী ব্যক্তিরা চাইলে আমেরিকায় স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারেন। তবে শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আমেরিকায় এক মিলিয়ন বা ১০ লাখ ডলার এককালীন বিনিয়োগ করতে হবে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বিনিয়োগের এই অঙ্ক পাঁচ লাখ ডলারও হতে পারে। তবে বাধ্যতামূলক হলো, অন্তত ১০ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষত একেবারে চরম দরিদ্র বা গ্রাম্য এলাকায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে অথবা আমেরিকার কিছু অঙ্গরাজ্যে, যেখানে মহাসড়ক বা অন্য উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে, সেখানে নির্দিষ্ট প্রকল্পে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে। নিজে বিনিয়োগ করলে লাভ ও ক্ষতির ঝুঁকি বিনিয়োগকারীকেই নিতে হয়।
আমেরিকার নন-ইমিগ্রান্ট ক্যাটাগরির ভিসা পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে ইবি-৫ ক্যাটাগরিতে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশ—ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী এসেছেন ভারত থেকে, ৩৪১ জন। পাকিস্তান থেকে ৮২ জন। এর পরেই বাংলাদেশের স্থান। এখান থেকে এসেছেন ৬২ জন। জানা গেছে, ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি ৩৬ জন বাংলাদেশি এই ক্যাটাগরিতে আবেদন করে সফল হয়েছেন। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ১৯ জন। আর গত বছর এই ক্যাটাগরিতে গ্রিনকার্ডের আবেদন করে সফল হয়েছেন সাতজন।

শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে এই ক্যাটাগরিতে আবেদন করেননি কেউ অথবা আবেদন করে সফল হননি কেউ। পুরো এশিয়া মহাদেশ থেকে ২০১৭ সালে ৮৮৭৮ জন অর্থ খরচ করে গ্রিনকার্ড নিয়েছিলেন। সেই হিসাবে বাংলাদেশিদের সংখ্যা একেবারেই কম বলে মনে করেন, এই গ্রিনকার্ড-সংক্রান্ত আবেদনের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীরা।
বাংলাদেশি আইনজ্ঞদের মধ্যে বিজনেস ইমিগ্রেশন নিয়ে কাজ করেন অ্যাটর্নি নাজমুল আলম। তিনি মনে করেন, এই খাতে গ্রিনকার্ড আবেদনের তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই কম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিরা তুলনামূলকভাবে এই প্রকল্পে নেই। সমস্যা একটাই দেখা যায়, টাকা তাঁরা বৈধভাবে আনতে পারেন না। এর কারণ, বাংলাদেশের অনেকে দেশের বাইরে অর্থ জমান। সেটা বৈধ পথের আয় কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। বৈধভাবে অর্থ এ দেশে না আনতে পারলে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার সেটা গ্রহণ করে না। আবার শুধু টাকাটা আনলেই হবে না, সেই টাকা আয়ের উৎস জানাতে হয়।’
বিজনেস বা কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন নেপালি বংশোদ্ভূত অ্যাটর্নি দিল্লিরাজ ভট্ট। কয়েক দিন আগে বাংলাদেশে গিয়ে এ বিষয়ে এক সেমিনারে অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘এই ক্যাটাগরিতে গ্রিনকার্ড পাওয়ার সুযোগ নিতে পারেন অনেকেই। কেননা সেখানে (ঢাকায়) অনেক মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। মনে হয়েছে, তাঁরা মুখিয়ে আছেন এখানে অর্থ বিনিয়োগ করতে। অনেকেই বলেছেন, তাঁরা কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মনে হয়, বৈধভাবে টাকাটা আনা একটু কষ্টকর। সে কারণেই এই ক্যাটাগরিতে তুলনামূলক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। চীন থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসে এই ইবি-৫ বা বিনিয়োগ ক্যাটাগরিতে।’
অ্যাটর্নি দিল্লিরাজ ভট্ট আরও বলেন, ‘অবশ্য যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সবাই যে এক মিলিয়ন ডলার খরচ করেছেন, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তাঁরা সরকারি বড় বড় কাজ যাঁরা করছেন, তাঁদের সঙ্গে বিনিয়োগকারীর খাতায় নাম উঠিয়েছে। সে ক্ষেত্রে যিনি বিনিয়োগ করছেন, তাঁর কাগজপত্রের পুরোটাই সম্পাদিত হয়েছে ওই বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সেসব ক্ষেত্রে ওই বিনিয়োগের টাকার মুনাফা তাঁরা পাবেন প্রচলিত নিয়মের ভিত্তিতে। বিনিয়োগ করা প্রকল্পে লোকসান হলে, বিনিয়োগকারীও লোকসানে পড়বেন। তবে এর বাইরে নিজেরা যাঁরা এককভাবে বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের নিজেদের ব্যবসায়ে মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনাও বেশি, আবার ঝুঁকিও আছে।’
ইবি-৫ ক্যাটাগরির গ্রিনকার্ড নিয়ে অনেকখানি অস্পষ্টতা আছে আগ্রহীদের। বিষয়টি অনেকখানি মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সিঙ্গাপুরে বিনিয়োগের মতোই। কিন্তু ওই সব দেশে কীভাবে টাকাটা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীর তরফে সেই হিসাব জানতে চায় না দেশগুলোর সরকার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ করে, গ্রিনকার্ড পেতে হলে বিনিয়োগকারীকে বৈধ পথে টাকা আনতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিনকার্ডপ্রাপ্তি ও অভিবাসনের নানা পন্থার মধ্যে কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এখনকার প্রশাসনের তরফে। সেই কর্মসংস্থানভিত্তিক ক্যাটাগরিগুলোই ইবি ক্যাটাগরি হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে অসাধারণ (এক্সট্রা অর্ডিনারি) গুণাবলিসম্পন্ন সাধারণ স্কলারদের জন্য ইবি-১, অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন গবেষকদের জন্য ইবি-২, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ ম্যানেজারদের জন্য ইবি-১-সি এবং ধর্মীয় নেতা, বিদেশে মার্কিন দূতাবাস বা অন্য সংস্থায় কর্মরত ছাড়াও আলাদা কর্মদক্ষদের জন্য ইবি-৪ ক্যাটাগরির অভিবাসন সুবিধা আছে। এই সব দক্ষ অভিবাসনে গত তিন বছরে অনেক বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার ক্যাটাগরিটাই ইবি-৫ ক্যাটাগরি নামে পরিচিত, যার সুযোগ নিতে শুরু করেছেন কোনো বাংলাদেশিরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here