সেই ভিক্ষুক মাকে নিয়ে সন্তানদের যত কথা

0
33

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্র কাঠি গ্রামের ৮০ বছরের বৃদ্ধ মা অসহায় হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করেছেন এমন অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করেছেন কন্যাসহ পাঁচ সন্তান। তাঁদের দাবি, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জের ধরে বাড়তি সুবিধা নিতে সেজ ভাই ইজিবাইকচালক গিয়াসউদ্দিন ভিক্ষাবৃত্তির অভিযোগ তুলেছেন। তবে গিয়াস উদ্দিনের দাবি, মা ভিক্ষাবৃত্তি করতেন।

বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের কাছে মনোয়ারা বেগমের একমাত্র মেয়ে স্কুলশিক্ষক মরিয়ম সুলতানা এবং পাঁচ ছেলে বরিশাল রেঞ্জের পুলিশের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) কাছে পৃথকভাবে এসব তথ্য জানিয়েছেন। বেলা ১১টায় বরিশাল সার্কিট হাউস সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসকের কাছে মরিয়ম সুলতানা বক্তব্য দেন। দুপুর ১২টায় বরিশালের ডিআইজির কাছে পাঁচ ছেলে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

মরিয়ম সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্বশুরবাড়িতে থাকার পরও আমি এবং আমার মেজ ভাই জসিমউদ্দিন মায়ের দেখভাল করছি। বড় ভাইসহ অন্য দুই ভাইও খোঁজ নিত। বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের মস্তিষ্কে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। সে কারণে বেশ কিছুদিন তাঁকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। মাঝে মাঝে তাঁকে ছেড়ে দিলে কারও কাছ থেকে কিছু চেয়ে নিত। এটাকে ভিক্ষাবৃত্তি বলা যাবে না। সেজ ভাই গিয়াসউদ্দিন ওই অভিযোগ তুলেছে।’

বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. সফিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই মায়ের পাঁচ ছেলেকে ডেকে আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন দাবি করেছেন, তাঁদের মা ভিক্ষাবৃত্তি করতেন না। তাঁরা সাধ্যমতো দেখভাল করতেন। মূলত জমি নিয়ে ভাইদের মধ্যে বিরোধের কারণে মাকে নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। তবে তাঁরা প্রত্যেকেই মায়ের দেখভাল করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।’

ডিআইজি কার্যালয়ে বৃদ্ধ মায়ের বড় ছেলে অবসরপ্রাপ্ত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমাদের সেজ ভাই গিয়াসউদ্দিন আমাদের সবার জমি দখল করে আছে। সেটা নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও করেছে। গিয়াসই মায়ের বিরুদ্ধে ভিক্ষাবৃত্তির মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে। এই অভিযোগ দিয়ে সে ফায়দা নিতে চায়।’

মেজ ছেলে বর্তমানে বরিশাল ডিআইজি কার্যালয়ে কর্মরত কনস্টেবল মো. জসিমউদ্দিন বলেন, ‘আমরা মায়ের চিকিৎসার জন্য বললেও গিয়াসউদ্দিন চিকিৎসা করাতে দেয়নি। তার কারণেই মায়ের এই অবস্থা হয়েছে।’ অন্য সন্তান ঢাকা পুলিশের এসআই নেছারউদ্দিনও একই অভিযোগ করেন।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত সন্তান গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘মা যে ভিক্ষা করে জীবন চালাতেন, সেটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে জানানো হয়েছে। আমি ইজিবাইকচালক, আমার পক্ষে দেখভাল করা সম্ভব না হওয়ায় মা ভিক্ষাবৃত্তি করতেন।’ ভাইদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজানোর অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এস এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বয়স বেশি হওয়া মনোয়ারা বেগম নানা রোগে আক্রান্ত। তার ওপর অনাহারে থাকায় তিনি চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। তাঁর একটি পা ভাঙা। আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসা দিতে চেষ্টা করছি।’

গত সোমবার সাংসদ শেখ মো. টিপু সুলতানের নির্দেশে ইউএনও দীপক কুমার রায় মনোয়ারা বেগমকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেন সাংসদ, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন।

তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন
ডিআইজি বলেন, এ ব্যাপারে একজন পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সুস্থ হয়ে যদি মা মামলা করতে চান, সে ব্যাপারেও সহযোগিতা দেওয়া হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে বৃদ্ধ ওই মায়ের যাবতীয় চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত সোমবার সাংসদ শেখ মো. টিপু সুলতানের নির্দেশে ইউএনও দীপক কুমার রায় মনোয়ারা বেগমকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। অভিযোগ উঠেছে, সন্তানেরা দেখভাল না করায় ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালাতেন মনোয়ারা বেগম। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মনোয়ারা বেগমের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন সাংসদ, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here