সখিপুরে ২৫ বছরের সংসারে নির্যাতনের অভিযোগ,স্বামী-দেবরের বিচার চেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে অসহায় মায়ের সংবাদ সম্মেলন
- আপডেট সময় : ১১:৩০:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে

‘বাবা-মা নেই, এক ভাইও মারা গেছেন। যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। দীর্ঘ ২৫ বছর সংসার করার পর আজ আমি কোথায় যাব?’—এভাবেই স্বামী ও দেবরের বিরুদ্ধে একের পর এক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার বানিয়ারচিট এলাকার গৃহবধূ শান্তা আক্তার।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকালে ন্যায় বিচার দাবি করে সখিপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন অসহায় গৃহবধূ শান্তা।

স্বামী হেকমত আলীর বিরুদ্ধে মারধর, ছুরিকাঘাত, ভরণপোষণ না দেওয়া, তালাক এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে দেবর লতিফ মিয়ার বিরুদ্ধেও হত্যাচেষ্টা, এসিড নিক্ষেপ ও বিভিন্ন ঘটনায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ করেছেন শান্তা। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার ও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শান্তা আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে হেকমত আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের দুই ছেলে রয়েছে। বিয়ের পর প্রথম ১৬-১৭ বছর স্বামী মোটামুটি ভালো থাকলেও গত সাত-আট বছর ধরে সংসারে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তিনি।
শান্তার অভিযোগ, গত ১৯ আগস্ট সকাল ৮টার দিকে হেকমত আলী তাকে মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেন। এ সময় তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলা হয় এবং না গেলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একই দিন বিকেলে আবারও তার ওপর হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে তাকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি বাধা দেন। তখন ছোট ছেলে রাজন হোসেনের সামনে স্বামী তাকে ছুরি দিয়ে পেটে আঘাত করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রক্তাক্ত অবস্থায় শান্তাকে তার বড় ছেলে উদ্ধার করে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি বাবার বাড়িতে চলে যান।
শান্তা বলেন, ঘটনার পর তিনি সখীপুর থানায় মামলা করতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেন। পরে আদালতে মামলা হলে হেকমত আলী কারাগারে যান। আপসের আশায় তাকে কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়।
তার দাবি, পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে ছয় লাখ টাকা কাবিন এবং ১০ শতাংশ জমি দেওয়ার বিষয়ে বায়না করা হলেও পরে ওই জমি লিখে দেওয়া হয়নি।
শান্তা অভিযোগ করে আরো বলেন , গত ১১ মার্চ তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তিনি পালিয়ে যাওয়ার সময় লতিফ মিয়া তার শরীরে পেছন থেকে এসিড নিক্ষেপ করেন। এতে তিনি দগ্ধ হয়ে ঢাকায় বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নেন বলে জানান।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলামকে জানালে তিনি সহযোগিতা না করে উল্টো তাকে গালিগালাজ করেন বলেও অভিযোগ করেন শান্তা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
শান্তা বলেন, গত ১০ মার্চ তিনি স্বজনদের সঙ্গে টাঙ্গাইলে গেলে লতিফের ইন্ধনে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর করেন। এ সময় তার ঘর থেকে তিন লাখ টাকা, তিন ভরি স্বর্ণালংকার ও বিভিন্ন আসবাবপত্র নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
শান্তা জানান, তার বড় ছেলে সাব্বির তার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাকেও বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি রাতে তাকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে একটি তরল পদার্থ খাওয়ানোর পর এলেঙ্গার একটি রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে সাব্বির মাদকাসক্ত এমন অভিযোগে তাকে পুলিশের কাছে দেওয়া হলেও পুলিশ কোনো অপরাধ না পেয়ে তাকে ছেড়ে দেয় বলে দাবি করেন শান্তা।
দীর্ঘ ২৫ বছরের সংসারে নিজের বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া ওয়ারিশ সম্পদ বিক্রি করে প্রায় ৪১ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন বলে দাবি করেছেন শান্তা।
তার ভাষ্য, স্বামীর ভিটায় ঘর নির্মাণ, গরু কেনা, আসবাবপত্রসহ সংসারের বিভিন্ন প্রয়োজনে তিনি ওই অর্থ ব্যয় করেছেন। কিন্তু এখন স্বামীর কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা তো পাচ্ছেনই না, বরং নির্যাতনের শিকার হয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।
শান্তার আরও অভিযোগ, গত সাত বছর ধরে স্বামী তাকে কোনো ভরণপোষণ দেন না। তার স্বামীর একাধিক বিয়ে ও অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগও করেছেন তিনি। এসব বিষয়ে স্বামীর বক্তব্য জানা যায়নি।
শান্তা বলেন, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে দুটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যেই গত সপ্তাহে হেকমত আলী তাকে আবার তালাক দিয়েছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বাবা-মা কেউ নেই। এক ভাইও মারা গেছেন। আমার যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন সহ্য করছি। আমি এখন কোথায় যাব? আমি মরা ছাড়া আর কোনো পথ দেখি না। আমি বাঁচতে চাই, আমি আমার স্বামী ও দেবরের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু বিচার চাই।”
সংবাদ সম্মেলনে তিনি সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী এড. আহমেদ আযম খানসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, নিজের ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।









